মূলত টেনশনের কারণে ১৯৯৮ সালে প্রথমবার হার্ট এটাক হলো। ২০০৩ সালে কোর্স করে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিলো সুস্থতা। নিয়মিত মেডিটেশন আর কুশল বিনিময়ে ‘শোকর আলহামদুলিল্লা
হৃদরোগে
-
হৃদরোগ কী?
হৃদযন্ত্রের যেকোনো ধরনের অসুস্থতা হলেও সাধারণভাবে হৃদরোগ বলতে করোনারি আর্টারি ডিজিজকে বোঝায়। এতে হৃৎপিণ্ডের ধমনীতে কোলেস্টেরল বা চর্বি জমে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে হৃৎপিণ্ডে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায় এবং বুকে ব্যথাসহ হৃদরোগের নানা উপসর্গ দেখা দেয়। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, ধূমপান, মেদস্থূলতা এবং টেনশনকে হৃদরোগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ মনে করা হয়। বিশ্বে প্রতিবছর দেড় কোটিরও বেশি মানুষ হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করে। পাশ্চাত্যে মোট মৃত্যুর শতকরা ৪৫ ভাগই ঘটে হৃদরোগে। আমেরিকায় প্রতি ৫ জনে ১ জনের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ। পাশ্চাত্যের অন্ধ-অনুকরণ আর ভ্রান্ত জীবনাচরণের কারণে বাংলাদেশসহ প্রাচ্যের দেশগুলোতেও এ রোগের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে হৃদরোগ মহামারি আকারে দেখা দেবে।
-
হৃদরোগের প্রচলিত চিকিৎসা
প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থায় ধমনীতে জমে থাকা চর্বির স্তর পরিষ্কার করার জন্যে ব্লকেজের পরিমাণ অনুসারে ওষুধ, এনজিওপ্লাস্টি কিংবা বাইপাস সার্জারির পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু এর কোনোটি দিয়েই পুনঃব্লকেজ প্রতিরোধ করা যায় না। এনজিওপ্লাস্টি করার ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশেরও বেশি রোগীর ধমনীর ব্লকেজ আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়।
কেন?
গবেষণায় দেখা গেছে, ব্লকেজ-এর চিকিৎসা করা হলেও এর কারণ ও পুনঃব্লকেজ প্রতিরোধের ব্যাপারে রোগীকে খুব ভালোভাবে সচেতন করা হয় না। ফলে অনেক রোগী পুনরায় নতুন ব্লকেজ নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এছাড়া হৃদরোগের ক্ষেত্রে অত্যধিক মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা অন্যতম প্রধান অনুঘটক যার কোনো চিকিৎসা হৃদরোগের প্রচলিত চিকিৎসায় অনুপস্থিত। তাই অপারেশনের পর রোগী যখন পুরনো জীবন অভ্যাসে ফিরে যায়, সে আবারও আক্রান্ত হয় ব্লকেজসহ হৃদযন্ত্রের নানা জটিলতায়। জরিপে দেখা গেছে, অপারেশনের পর প্রতি ২০ জনে ১ জন রোগীর পুনরায় হার্ট অ্যাটাক হয় এবং স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় ৪০ জনে ১ জন রোগী। আর দ্বিতীয়বার বাইপাস করানো মানে ঝুঁকির পরিমাণ ১০% থেকে ২০% বেড়ে যাওয়া। অপারেশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং বিপুল ব্যয়ভারের কথা তো বলাই বাহুল্য। হৃদরোগের প্রচলিত চিকিৎসা অর্থাৎ এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারি যে কোনো স্থায়ী সমাধান নয় তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য পাঠ্য বই- ডেভিডসন’স প্রিন্সিপালস এন্ড প্র্যাকটিস অফ মেডিসিন এর সাম্প্রতিক সংস্করণে খুব স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে। -
নতুন আশা নতুন বিশ্বাস
অথচ খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে এর চেয়ে অনেক ভালো ফল পাওয়া গেছে বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতায়। এতদিন চিকিৎসকরা বিশ্বাস করতেন, আর্টারি একবার ব্লক হওয়া শুরু করলে বাইপাস সার্জারি কিংবা এনজিওপ্লাস্টি ছাড়া কোনো পথ নেই। চিকিৎসকদের এই রক্ষণশীল চিন্তার মর্মমূলে প্রথম আঘাত হানেন ক্যালিফোর্নিয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. ডীন অরনিশ। যোগগুরু স্বামী সৎচিদানন্দের যোগ ব্যায়াম, ধ্যান এবং নিরামিষ ভোজনের জীবন দর্শনে প্রভাবিত হয়ে হৃদরোগের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৮৭ সালে ৪৮ জন রোগীকে ২ ভাগে ভাগ করে ডা. অরনিশ এ গবেষণাটি চালান। এক গ্রুপের ২৮ জনকে এক বছর ধরে কম চর্বিযুক্ত খাবার দেয়া হয়, মেডিটেশন ও যোগ ব্যায়ামের অনুশীলন করানো হয়। সেইসাথে ধূমপান বর্জন এবং রোগীদেরকে মমতা ও সহানুভূতিপূর্ণ মানসিক অবস্থায় রাখার চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে বাকি ২০ জনকে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন নির্দেশিত পথ্যবিধি এবং প্রচলিত চিকিৎসার অধীনে রাখা হয়। এক বছর পর দুই গ্রুপের ওপরই পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায় ১ম গ্রুপের রোগীদের আর্টারিতে ব্লকেজের পরিমাণ তো বাড়েই নি, বরং কমেছে এবং হার্টে রক্ত চলাচল বেড়েছে। অন্যদিকে প্রচলিত চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও দ্বিতীয় গ্রুপের প্রায় সবারই ব্লকেজের পরিমাণ বেড়েছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, যে রোগীরা বেশি দিন ধরে এ প্রক্রিয়া অনুশীলন করেছেন, অন্যদের চেয়ে তারা বেশি উপকার পেয়েছেন। ১৯৯৮ সালে জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন-এ গবেষণাটি সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। ডা. ডীন অরনিশের এ গবেষণা আমেরিকায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার ‘প্রোগ্রাম ফর রিভার্সিং হার্ট ডিজিজ’ বেস্ট সেলার গ্রন্থে রূপান্তরিত হয়। সাপ্তাহিক নিউজ উইক এর জুলাই ২৪, ১৯৯৫ এর প্রচ্ছদ নিবন্ধে বলা হয়, ওমাহার একটি নামকরা বীমা কোম্পানি ২০০ হৃদরোগীকে ড. ডীন অরনিশের হৃদরোগ নিরাময় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ একটি বাইপাস করাতে যেখানে ৪০ হাজার ডলার খরচ হয় সেখানে অরনিশের বছরব্যাপী প্রোগ্রামে খরচ মাত্র সাড়ে ৫ হাজার ডলার। এতে ২০০ রোগীর মধ্যে ১৯০ জন এ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ অব্যহত রাখেন। এক বছরে ১৯০ জনের মধ্যে ১৮৯ জন সুস্থ হয়ে যান। মাত্র ১ জন রোগীর অপারেশনের প্রয়োজন হয়। এ অভাবনীয় সাফল্যের ফলে সারাদেশ থেকে হাসপাতালগুলো ডাক্তারদের বিভিন্ন টিম ডা. অরনিশের কাছে পাঠাচ্ছে এ প্রক্রিয়া শেখানোর ট্রেনিং নিতে। কারণ এ প্রক্রিয়ায় যে শুধু অপারেশনের খরচ বাঁচে তা-ই নয়, বরং অপারেশনের পর রোগীকে যে সারাজীবন ধরে ওষুধ খেতে হয়, সে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও ব্যয় বহন করা থেকেও রোগী মুক্তি পায়। ওষুধ ও সার্জারি ছাড়া হৃদরোগ নিরাময়ে ডা. অরনিশের এ প্রক্রিয়া এত ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে যে, একে আর বিকল্প চিকিৎসা বলা যায় না। বলতে হয় হৃদরোগ চিকিৎসার মূলধারায় এর অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে।
-
কীভাবে সম্ভব?
৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে সানফ্রান্সিসকোর ডা. মেয়ার ফ্রেডম্যান এবং ডা. রে রোজেনম্যান দীর্ঘ গবেষণার পর দেখান যে, হৃদরোগের সাথে অস্থিরচিত্ততা, বিদ্বেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবন পদ্ধতির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
মার্কিন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রিচটন দীর্ঘ গবেষণার পর দেখিয়েছেন যে, হৃদরোগের কারণ প্রধানত মানসিক। তিনি বলেছেন, কোলেস্টেরল বা চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে করোনারি আর্টারিকে প্রায় ব্লক করে ফেললেই যে হার্ট অ্যাটাক হবে এমন কোনো কথা নেই।
কোরিয়া যুদ্ধের সময় রণক্ষেত্রে নিহত সৈনিকদের অটোপসি করা হতো। ডাক্তাররা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করেন, নিহত তরুণ সৈনিকদের শতকরা ৭০ জনেরই আর্টারি চর্বি জমে প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে (অ্যাডভান্সড স্টেজ অফ অ্যাথেরোসক্লেরোসিস) এবং দ্রুত হার্ট অ্যাটাকের পথে এগুচ্ছে। এদের মধ্যে ১৯ বছর বয়স্ক তরুণ সৈনিকও ছিলো। ডা. ক্রিচটন প্রশ্ন তোলেন, যদি শুধু করোনারি আর্টারিতে চর্বি জমাটাই হৃদরোগের কারণ হতো তাহলে তো এই তরুণ সৈনিকদের মৃত্যু গুলির আঘাতে নয়, হৃদরোগেই হতো।
করোনারি আর্টারির ৮৫% বন্ধ অবস্থা নিয়েও একজন ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নিয়েছেন; আবার দেখা গেছে একেবারে পরিষ্কার আর্টারি নিয়ে অপর একজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। রোগ ও অসুস্থতা থেকে মুক্তির জন্যে প্রথম প্রয়োজন এই দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনদৃষ্টির পরিবর্তন। আর দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনদৃষ্টি পরিবর্তনের সবচেয়ে সহজ পথ হলো মেডিটেশন। -
নিজের দায়িত্ব নিতে হবে নিজেকেই
বলা হয়, Patient cure themselves, doctors show the way. নব্য চিকিৎসা ধারার প্রবর্তক ডা. ডীন অরনিশ, ডা. দীপক চোপড়া, ডা. ল্যারী ডসি, ডা. জন রবিন্স, ডা. কার্ল সিমনটন, ডা. বার্নি সীজেল, ডা. ক্রিশ্চিয়ানে নর্থট্রপ, ডা. হার্বার্ট বেনসন, ডা. জোয়ান বরিসেঙ্কো, ডা. এন্ড্রু ওয়েলস, ডা. এডওয়ার্ড টাওব, ডা. মিখাইল স্যামুয়েলস প্রমুখ বডি, মাইন্ড, স্পিরিট সাময়িকীর ১৯৯৭ সালের বিশেষ সংখ্যায় একবিংশ শতকের স্বাস্থ্য প্রচ্ছদ কাহিনীতে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে মত প্রকাশ করেছেন যে, সুস্থ থাকতে হলে নিজের স্বাস্ব্যের দায়িত্ব নিজেকেই গ্রহণ করতে হবে। নিজেকে নিরাময় করার ক্ষমতা প্রতিটি মানুষের সহজাত ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত।এই সহজাত ক্ষমতার সাথে নিজের বিশ্বাসকে সম্পৃক্ত করতে পারলে প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থার শতকরা ৯০ ভাগ খরচই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। কারণ বাইপাস সার্জারি, এনজিওপ্লাস্টি বা সারাজীবন কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রক ওষুধ সেবনের চাইতে সঠিক জীবনদৃষ্টি গ্রহণ করে জীবনধারা পরিবর্তনের খরচ অনেক কম।
ডা. হার্বার্ট বেনসন বলেন, একজন মানুষ নিজেই শিথিলায়ন, মেডিটেশন, ব্যায়াম ও পুষ্টি সংক্রান্ত জ্ঞান লাভ করতে পারে এবং নিজের জীবনে তা প্রয়োগ করতে পারে। বর্তমানে যেখানে রোগী ওষুধ বা সার্জারির ওপর নির্ভর করছে সেখানে তাদেরকে নিজের ওপর নির্ভর করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় ওরিয়েন্টেশন
হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাব শুরু করেছে ২ দিনের হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় ওরিয়েন্টেশন।
# হৃদরোগের কারণ, ধরন ও পরিচিতি সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের সচেতন করে তোলা
# হৃদরোগের জন্যে দায়ী ভ্রান্ত জীবনদৃষ্টি এবং অবৈজ্ঞানিক খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি
# হৃদরোগের কারণ অনুসন্ধান ও নিরাময়ের বিশেষ মেডিটেশন
# হৃদরোগীদের জন্যে উপযোগী কোয়ান্টাম ব্যায়ামের প্রশিক্ষণ
# হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে শুকরিয়া ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব ব্যাখ্যা

-
হৃদরোগ নিরাময় ও প্রতিরোধ কোর্সের মূল থিম
১. জীবনদৃষ্টি
২. মেডিটেশন
৩. খাদ্যাভ্যাস
৪. ব্যায়াম
৫. কাউন্সেলিং
জীবনদৃষ্টি : অন্য আর সব অসুস্থতার মতো হৃদরোগ নিরাময়েও প্রয়োজন যথাযথ জীবনদৃষ্টি। কোর্সে রয়েছে হৃদরোগের মূল কারণ ভ্রান্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা। সেইসাথে ইতিবাচক ও শুকরিয়ার সম্পর্কেও আলোচনা। ফলে অংশগ্রহণকারীরা দুশ্চিন্তা ও স্ট্রেসমুক্ত হয়ে স্বতঃস্ফূর্ত নিরাময়ের পথে এগিয়ে যান।
মেডিটেশন : মনের প্রভাব শরীরের ওপর পড়ে। তাই মন যত হালকা প্রশান্ত ও টেনশনমুক্ত থাকবে আপনার হৃদযন্ত্রও তত ভালো থাকবে। হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ের ক্ষেত্রে মেডিটেশনের ভূমিকা এখন প্রমাণিত ও বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। কার্ডিওলজির প্রধান বইগুলোতে বলা হয়েছে যে, মেডিটেশন করোনারি ধমনীকে এথেরোরিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় ক্রমান্বয়ে কোলেস্টেরলমুক্ত করে তোলে। হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় কোর্সে আছে বিশেষ বিষয়ভিত্তিক ৪টি মেডিটেশন। এগুলো হলো: হৃদয়ের কথা, আত্মপর্যালোচনা, হৃদরোগ নিরাময়ের মনছবি এবং সুস্থ হৃদপিণ্ড।
খাদ্যাভ্যাস : নিরাময় ও সুস্বাস্থ্য অর্জনের জন্যে প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক খাদ্যাভ্যাসই হলো কোয়ান্টাম খাদ্যাভ্যাস।
ব্যায়াম : যোগ ব্যায়ামের সবচেয়ে সহজ ও আধুনিক সংস্করণ হলো কোয়ান্টাম ব্যায়াম। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট কোয়ান্টাম ব্যায়াম হৃদযন্ত্রকে রাখে সুস্থ ও সজীব। হৃৎপিণ্ডের সুস্থতার জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যায়ামগুলো হলো- উজ্জীবন, ভুজঙ্গাসন, অর্ধ-শলভাসন, শলভাসন, পবনমুক্তাসন, গো-মুখাসন, উষ্ট্রাসন, পদ্মাসন, বজ্রাসন, শবাসন।
কাউন্সেলিং : সপ্তাহে ১ দিন গ্রুপ-সাপোর্ট ও কাউন্সেলিং সেশনে হার্ট ক্লাবের সদস্যরা পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে ভেতরে জমে থাকা দু:খ কষ্ট ক্ষোভ থেকে ভারমুক্ত হয়ে ওঠেন। এর পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাউন্সেলিংযের ফলে নিরাময়ের ব্যাপারে তারা হয়ে ওঠেন ইতিবাচক ও আশাবাদী। -
সাপ্তাহিক ফলো-আপ প্রোগ্রাম ও কাউন্সেলিং সেশন
বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর
পারস্পরিক অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা বিনিময়
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাথে ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং
মেডিকেল চেক-আপ
কোয়ান্টাম ব্যায়ামের প্রশিক্ষণ
বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর : প্রতি সপ্তাহে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে হৃদরোগ সম্পর্কিত ও বিভিন্ন জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় নিয়ে থাকে প্রাণবন্ত আলোচনা। এ পর্যন্ত যে আলোচনাগুলোর একটা সামারি।
পারস্পরিক অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা বিনিময় : সাপ্তাহিক কাউন্সেলিং সেশনে মেডিটেশনের পর ক্লাবের সদস্যরা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে বসে কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাব নির্দেশিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও মত বিনিময় করেন। এতে সুস্থ হৃদযন্ত্রের জন্যে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো তারা কে কীভাবে অনুসরণ করছেন তা ব্যক্ত করেন ও পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ করেন। এর ফলে যিনি যে বিষয়টি অনুসরণ করছেন না বা করতে পারছেন না তিনি সে নির্দেশনাটিও অনুসরণে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। এছাড়াও গ্রুপের সদস্যরা নিজেদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ব্যক্তিগত দু:খ, কষ্ট, ক্ষোভ ও টেনশনের কারণগুলো নিজেদের মধ্যে শেয়ার করেন। প্রত্যেকটি গ্রুপে একজন করে মেডিকেল কাউন্সিলর সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাথে ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং : গ্রুপ কাউন্সেলিং ছাড়াও ক্লাবের সদস্যরা যেকোনো বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও কাউন্সিলরদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কাউন্সেলিং করে থাকেন। এতে কোনো বিষয় বুঝতে কারো অসুবিধা হলে তিনি খুব সহজেই সে ব্যাপারে জেনে নিতে পারেন। এছাড়া টেলিফোনেও হার্ট ক্লাবের সদস্যদের ব্যক্তিগত কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ রয়েছে।
মেডিকেল চেক-আপ : সাপ্তাহিক কাউন্সেলিং সেশনে প্রতিমাসে ১ দিন সদস্যদের মেডিকেল চেক-আপ করা হয়ে থাকে। এতে প্রত্যেক সদস্যের ব্লাড প্রেসার, পাল্স ও যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করে প্রত্যেকের জন্যে সংরক্ষিত ফাইলে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। এছাড়া তাদের শারীরিক যে কোনো সমস্যার জন্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে।
কোয়ান্টাম ব্যায়ামের প্রশিক্ষণ : কাউন্সেলিং প্রোগ্রামের আওতায় প্রতিমাসে ১ দিন কোয়ান্টাম ব্যায়ামের অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক ও মেডিকেল কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্যে প্রয়োজনীয় আসনগুলো প্রদর্শন করা হয়। মহিলা ও পুরুষদের জন্যে থাকে আলাদা আলাদা সেশনে ব্যায়াম প্রশিক্ষণের এই সুযোগ।
-
কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাব ॥ আমাদের টিম
কো-অর্ডিনেটর
ডা. মনিরুজ্জামান
এমবিবিএস, পিজিটি (শিশু রোগ), বিসিএস (পদ.)
মেডিকেল কাউন্সিলর
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী
এমবিবিএস, এফসিপিএস
সহযোগী অধ্যাপক, শিশু বিভাগ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
ডা. সাবরীনা ইয়াসমীন
এমবিবিএস, এফসিপিএস (মেডিসিন-শেষ পর্ব)
ডা. আতাউর রহমান
এমবিবিএস, পিজিটি (কার্ডিওলজি), পিজিটি (মেডিসিন)
ডা. কানিজ ফাতেমা
এমবিবিএস, এম ফিল (ভাইরোলজি- শেষ পর্ব)
ডা. মঞ্জুর-ই-ফাতিমা
এমবিবিএস, এম ডি (ফিজিওলজি- প্রথম পর্ব)
ডা. রুমানা পারভীন
এমবিবিএস, এফসিপিএস (শিশু রোগ- শেষ পর্ব)
ডা. আবুল হোসেন
এমবিবিএস, এম এস (ইউরোলজি), এফসিপিএস (ইউরোলজি- শেষ পর্ব)
ডা. আয়েশা তাহেরা
এমবিবিএস, এফসিপিএস (শিশু রোগ - শেষ পর্ব)
হৃদরোগে মেডিটেশন
মেডিটেশন : হৃদরোগ প্রতিরোধে
ডা. ডেভিড ওরমে জনসনের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় যারা নিয়মিত মেডিটেশন করেন তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার হার ৮৭.৩% কম। আসলে সবচেয়ে বড় বড় যে ঝুঁকিগুলোর কারণে হৃদরোগ হয়, যেমন- কোলেস্টেরল বেশি হওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, মোটা হয়ে যাওয়া এবং স্ট্রেস- এই বিষয়গুলো যারা নিয়মিত মেডিটেশন করে তাদের হওয়ার সম্ভাবনা অনেক অনেক কমে যায়।
-
কোলেস্টেরল :
কোলেস্টেরল হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক কারণ। মেডিটেশন অস্বাভাবিক বেশি কোলেস্টেরল মাত্রাকে কমিয়ে আনতে পারে। ১৯৭৯ সালে দুজন গবেষক এম জে কুপার এবং এম এম আইজেন ২৩ জন উচ্চ কোলেস্টেরল রোগীর মধ্যে ১২ জনকে মেডিটেশন করান। ১১ মাস পর দেখা যায় যে, মেডিটেশনকারী গ্রুপের কোলেস্টেরল ২৫৫ থেকে ২২৫-এ নেমে এসেছে। আমেরিকায় ২২০ মাত্রাকে স্বাভাবিক গড় মাত্রা ধরা হয়।
মেডিকেল কলেজ অফ জর্জিয়ার ফিজিওলজিস্ট ডা. বার্নেস ১১১ জন তরুণ স্বেচ্ছাসেবীর ওপর এক গবেষণা চালান। এদের মধ্যে ৫৭ জনকে মেডিটেশন করানো হয়, বাকিদের শুধু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যাদি শেখানো হয়।
৮ মাস পর দেখা যায় ১ম গ্রুপের সদস্যদের রক্তবাহী নালীর সংকোচন-সম্প্রসারণ ক্ষমতা বেড়েছে ২১% যা হৃৎপিণ্ডের সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কারণ এনডোথিলিয়াম নামের রক্তনালীর আবরণের এই অসুবিধা থেকেই অল্পবয়সে একজন মানুষের শরীরে শুরু হয় হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রক্রিয়া। অন্যদিকে ২য় গ্রুপের এ ক্ষমতা কমেছে ৪%। বয়স বাড়লে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও ১ম গ্রুপের ক্ষেত্রে কমেছে। ডা. বার্নেস বলেন, লিপিড কমানোর ওষুধ ব্যবহার করে যে ফল আগে পাওয়া যেত তা-ই পাওয়া যাচ্ছে মেডিটেশনে। ২০০৭ সালে আমেরিকান সাইকোসোমাটিক সোসাইটির বার্ষিক কনফারেন্সে এ রিপোর্টটি পেশ করা হয়। -
উচ্চ রক্তচাপ :
এখন থেকে ৩ দশক আগেই হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষক ড. হার্বার্ট বেনসনের গবেষণায় দেখা যায় যে মেডিটেশনের ফলে রক্তচাপ কমে। তারপর থেকে এ যাবৎকালে শত শত গবেষণায় এ বিষয়টিই বার বার উঠে এসেছে যে মেডিটেশন রক্তচাপ কমায়।
১৯৯৪ সালে লিন্ডেন এবং চেম্বার্স পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় সিস্টোলিক এবং ডায়াস্টলিক প্রেসার কমানোর ক্ষেত্রে মেডিটেশন রাসায়নিক ওষুধের মতোই কাজ করে। ১৯৯৭ সালের আরেক গবেষণায় ড. শাপিরো দেখান ৬ সপ্তাহ ধরে শিথিলায়ন এবং দৃষ্টিভঙ্গি বদলের অনুশীলন করেছেন যে উচ্চরক্তচাপের রোগীরা তাদের ওষুধ লেগেছে অন্যদের চেয়ে কম। শুধুমাত্র মেডিটেশন চর্চা করে অধিকাংশ রক্তচাপ আক্রান্ত রোগী অনায়াসেই নিজের প্রেসার সংকটসীমার নিচে অর্থাৎ ১৩০/৯০-এ নামিয়ে আনতে পারেন এবং এতে তার স্ট্রোক করার সম্ভাবনা বহুগুণ হ্রাস পায়।
২০০৪ সালে আমেরিকার জার্নাল অফ হাইপারটেনশন-এ ১৫৬ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর ৩ মাস ধরে চালানো গবেষণার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায় প্রেশার কমাবার জন্যে যারা খাবার বা ব্যায়ামনির্ভর চর্চা করেছে এবং যারা কিছুই করেনি এই দুই গ্রুপের তুলনায় যারা মেডিটেশন করেছে তাদের সিস্টোলিক এবং ডায়াস্টলিক দুটোই উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। Related references -
ডায়াবেটিস :
গবেষণায় দেখা গেছে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত মেডিটেশন অত্যন্ত ফলপ্রসূ। ২০০৮ সালে থাইল্যান্ডের বিজ্ঞানী চাইওপানোন্ট ৫০ জন টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীর ওপর গবেষণা করেন। সকালে নাশতার পর এই রোগীদেরকে তিনি মেডিটেশন করান। দেখা গেল, মেডিটেশন এবং পরিমিত জীবনপদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক আছে।
আরেক গবেষণায় রোজেনউইক ও তার সহকর্মীরা ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে HbA1c (গাইকোসাইলেটেড হিমোগ্লাবিন) এর মাত্রা পর্যবেক্ষণ করেন। HbA1c হলো একধরনের গ্লুকোজ জাতীয় হিমোগ্লোবিন যা ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে দেখা যায়। তারা দেখেন মেডিটেশন রক্তে এই HbA1c এর মাত্রা কমিয়ে দেয়। সেই সাথে রক্তচাপকেও স্বাভাবিক রাখে। এমনকি এই গবেষণাও প্রমাণ করে মেডিটেশন হতাশা, দুঃশ্চিন্তা ও নানা রকম মানসিক অস্থিরতা কমায়। ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ার এগুলোও উল্লেখযোগ্য কারণ। Related references -
ধূমপান :
২০০৭ ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনের স্কুল অব মেডিসিন এন্ড পাবলিক হেলথের গবেষক ডেভিস ও তার সহযোগীরা একটি গবেষণা পরিচালনা করেন ১৮ জন ধূমপায়ীর ওপর যারা প্রায় ২৭ বছর ধরে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ টা করে সিগারেট খেতো। মেডিটেশন শেখার সময়ই তারা ধূমপান ছেড়ে দেন। ৬ সপ্তাহ পরে তাদের দেহের কিছু পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে তাদের মধ্যে ১০ জন সত্যি সত্যিই স্থায়ীভাবে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন। Related references
-
স্থূলতা :
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে মেডিটেশন স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরিতে সহায়তা করে। ইন্ডিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর দ্যা স্টাডি অফ হেলথ, রিলিজিয়ন এন্ড স্পিরিচুয়ালিটি-র ডিরেক্টর জেন ক্রিসলার ১৮ জন স্থূলকায়া মহিলার উপর এক গবেষণা চালান। দেখা গেলো মেডিটেশন করার পর তাদের ওজন বৃদ্ধির হার কমেছে। আগে যেখানে সপ্তাহে ছিলো ৪ তা এখন মাত্র দেড়।
গবেষক সিং এবং তার সহকর্মীরা এক গবেষণায় দেখতে পান যে, প্রেডার-উইলি সিনড্রোমে আক্রান্ত অল্পবয়স্করা যদি নিয়মিত মেডিটেশন, ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস করেন তবে তারা ওজন কমাতে সফল হয়। প্রেডার উইলি সিনড্রোম হলো অতিভোজনের কারণে ওজন বাড়ার এক ধরনের বংশগত রোগ। এই রোগে আক্রান্তরা অনেক খাওয়া-দাওয়ার পরও সবসময় ক্ষধাবোধে ভুগতে থাকে। ফলে ছোটবেলা থেকেই মোটা হতে হতে এক সময়ে চলে যায় আয়ত্তের বাইরে এবং আক্রান্ত হয় নানা জটিলতায়। Related references -
স্ট্রেস :
স্ট্রেস শুধু আমাদের মানসিক প্রশান্তিই নষ্ট করে না বরং এটি দেহে সৃষ্টি করে নানারকম রোগ। ফলে কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে গুণতে হয় কোটি কোটি টাকার লোকসান। হার্ভার্ডের ফিজিওলজিস্ট ওয়াল্টার ক্যানন আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগেই আবিষ্কার করেন যে আমরা যখন স্ট্রেসড হই তখন আমাদের রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, মাংসপেশীর চাপ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যায়। হার্ভার্ডেরই আরেক গবেষক ডা. হার্বার্ট বেনসন ১৯৬৭ সালে দেখান যে মেডিটেশন আমাদের শরীরে স্ট্রেসের ঠিক বিপরীত প্রতিক্রিয়া ঘটায় অর্থাৎ রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, মাংসপেশীর চাপ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিকে স্বাভাবিক রাখে। তার লেখা ‘দ্যা রিলাক্সেশন রেসপন্স’ বইয়ে তিনি বলেছেন, স্ট্রেসের কারণে আমাদের দেহে যে ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স সৃষ্টি হয় সেটিকে প্রশমিত করে মেডিটেশন মন ও দেহকে অধিকতর শান্ত ও সুখী অবস্থায় নিয়ে আসে। বইটি ছিল সর্বাধিক বিক্রিত। অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে যে, মেডিটেশন আমাদের দেহে স্ট্রেসের জন্যে দায়ী হরমোন কর্টিসলের নি:সরণ কমিয়ে দেয়।
ক্রনিক স্ট্রেস আমাদের শরীরে ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ বাড়িয়ে দিয়ে বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করে এবং ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অ্যাজমা, সোরিয়াসিসের মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। গবেষণায় দেখা গেছে মেডিটেশন ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ হ্রাস করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০০৬ ও ২০০৮ সালে গবেষক ড্যান উইজক ও তার সহকর্মীরা ৬০ জন স্বেচ্ছাসেবকদের উপর এক অভিনব পদ্ধতি ‘আলট্রা উইক ফোটন ইমিশন মেসারমেন্ট' প্রয়োগ করে তাদের দেহকোষে বিক্রিয়াশীল অক্সিজেন পরিমাপ করেন এবং দেখতে পান যে যারা নিয়মিত মেডিটেশন করেন তাদের দেহে এই ফোটন রেডিয়েশন এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মাত্রা অনেক কম। Related references
মেডিটেশন : হৃদরোগ নিরাময়ে
আরো বিস্ময়কর যে মেডিটেশনের মাধ্যমে হৃদরোগের নিরাময়ও সম্ভব। ডেভিডসনের প্রিন্সিপালস এন্ড প্রাকটিসেস অব মেডিসিন বইতে যেমনটি বলা আছে যে, প্রচলিত চিকিৎসা দিয়ে কেবল উপসর্গগুলোর নিরাময় করা সম্ভব। কিন্তু তা দিয়ে রোগের পরিপূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়।
কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে মেডিটেশন তা পারে। গবেষণায় এটাই দেখা গেছে। ২৩টি গবেষণার একটি মেটা এনালিসিস থেকে প্রফেসর লিন্ডেল, স্টসেল এবং মরিস দেখেন প্রচলিত চিকিৎসার সাথে সুস্থ জীবনদৃষ্টি, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, মেডিটেশন ইত্যাদি যোগ করা হয়েছে এমনসব ক্ষেত্রে দেখা গেছে রোগীর মৃত্যুর হারকে কমিয়ে ফেলা গেছে প্রায় ৪১%। আবার হার্ট এটাকের হারও কমেছে ৪৬%।
-
কীভাবে সম্ভব?
৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে সানফ্রান্সিসকোর ডা. মেয়ার ফ্রেডম্যান এবং ডা. রে রোজেনম্যান দীর্ঘ গবেষণার পর দেখান যে, হৃদরোগের সাথে অস্থিরচিত্ততা, বিদ্বেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবন পদ্ধতির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
মার্কিন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রিচটন দীর্ঘ গবেষণার পর দেখিয়েছেন যে, হৃদরোগের কারণ প্রধানত মানসিক। তিনি বলেছেন, কোলেস্টেরল বা চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে করোনারি আর্টারিকে প্রায় ব্লক করে ফেললেই যে হার্ট অ্যাটাক হবে এমন কোনো কথা নেই।
কোরিয়া যুদ্ধের সময় রণক্ষেত্রে নিহত সৈনিকদের অটোপসি করা হতো। ডাক্তাররা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করেন, নিহত তরুণ সৈনিকদের শতকরা ৭০ জনেরই আর্টারি চর্বি জমে প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে (অ্যাডভান্সড স্টেজ অফ অ্যাথেরোসক্লেরোসিস) এবং দ্রুত হার্ট অ্যাটাকের পথে এগুচ্ছে। এদের মধ্যে ১৯ বছর বয়স্ক তরুণ সৈনিকও ছিলো। ডা. ক্রিচটন প্রশ্ন তোলেন, যদি শুধু করোনারি আর্টারিতে চর্বি জমাটাই হৃদরোগের কারণ হতো তাহলে তো এই তরুণ সৈনিকদের মৃত্যু গুলির আঘাতে নয়, হৃদরোগেই হতো।
করোনারি আর্টারির ৮৫% বন্ধ অবস্থা নিয়েও একজন ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নিয়েছেন; আবার দেখা গেছে একেবারে পরিষ্কার আর্টারি নিয়ে অপর একজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। রোগ ও অসুস্থতা থেকে মুক্তির জন্যে প্রথম প্রয়োজন এই দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনদৃষ্টির পরিবর্তন। আর দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনদৃষ্টি পরিবর্তনের সবচেয়ে সহজ পথ হলো মেডিটেশন।







